মানস পাল
প্রাচীন ত্রিপুরার সমতল সহ গঠিত সমতট, হরিকেল , প্যাট্টিকেরা-র বাসিন্দারা ছিলেন বর্তমান প্রজন্মের বাঙালিদের প্রাচীন পূর্বপুরুষরা
এই আর্টিকেল এর প্রথম ভাগেই বলেছিলাম বর্তমান ত্রিপুরার ভৌগোলিক চিত্র বা অবস্থান দিয়ে প্রাচীন ত্রিপুরার ইতিহাস বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ ভুল হতে বাধ্য। প্রথমতঃ এই ত্রিপুরার সমতল অঞ্চলের প্রায় পুরোটাই প্রাচীনকালে পুরোপুরি উন্মুক্ত ও সম্পৃক্ত ছিল বর্তমান বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ ও ডাইন্যাস্টি — যেমন সমতট, হরিকেল , প্যাট্টিকেরা সঙ্গে।
মনে রাখতে হবে সমতট -এর ইতিহাস আমরা মোটামোটি চতুর্থ শতাব্দী বা এর অল্প আগে পাই , অন্যদিকে হরিকেল ইতিহাস মোটামোটি ৭ম/ ৮ম শতাব্দী থেকে , প্যাট্টিকেরা একাদশ শতক বলা যায়। .চতুর্থ শতাব্দী বা ৭ম/ ৮ম শতাব্দী এই সময়ে বর্তমান ত্রিপুরার চিত্র এরকম ছিল না , আর ওই সময়ের ত্রিপুরার ত্রিপুরীদের সমতলে বাস ছিল বা তাঁদের কোন কীর্তিকলাপ ছিল এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। অথচ ঐতিহাসিক ভাবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এটা আজ প্রমাণিত যে এই প্রাচীন ত্রিপুরার সমতল সহ গঠিত সমতট, হরিকেল , প্যাট্টিকেরা-র বাসিন্দারা ছিলেন বর্তমান প্রজন্মের বাঙালিদের প্রাচীন পূর্বপুরুষরা। অপরদিকে ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চলে ত্রিপুরীদের বসতি ছিল , অন্ততঃ তাঁদের আসাম হয়ে এতদঞ্চলে দশম বা একাদশ শতকের (?) কোন একসময়ে আসার পর থেকেই। অর্থাৎ বর্তমান ত্রিপুরার ভৌগোলিক চিত্র ধরলেও বলা যায়, এর সমতলে ছিলেন এখনকার বাঙালিদের পূর্বপুরুষরা আর পাহাড়ি অঞ্চলে ছিলেন ত্রিপুরীদের পূর্বপুরুষরা। সে অর্থে এখনকার বাঙালিরাও ত্রিপুরীদের মত এখানকার ভূমিপুত্র বলে চিহ্নিত হবার দাবি রাখে। এখন, এতো বছর ধরে বিজ্ঞান ভিত্তিক ইতিহাস না পড়ানোর ফলে যা হবে তাই হয়েছে — এখানকার সকল বাঙালি ”বাংলাদেশী বলে ‘ আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
কিন্তু বাঙালিরা-ও যে এই অঞ্চলের ভূমিপুত্র এই দাবি তো আমি করলে হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক উপাদান যেগুলি সারা বিশ্বে গ্রহণযোগ্য এবং প্রমাণিত ( এই বৈজ্ঞানিক উপাদান গুলি সম্পর্কে আমি আলাদা একটি পূর্ববর্তী পোস্টে উল্লেখ করেছি) তবে বোঝার সুবিধার্থে আবার কয়েকটি উল্লেখ করছি। Archaeological evidence — excavated settlements, habitation layers, buildings, fortifications, roads, temples, burials, hearths, tools and other material remains. Epigraphic evidence (inscriptions) — inscriptions on stone, copper plates, pillars, temple walls, seals, etc. These are among the strongest sources for identifying rulers, dynasties, administrative units, land grants, religious institutions and geographical names. এছাড়া রয়েছে Numismatic evidence (coins) — coins help establish rulers, chronology, political authority, trade networks, economic conditions, religious symbols and sometimes territorial influence, Art history and iconography — sculpture, temple architecture, terracotta, paintings, religious imagery and stylistic sequences can reveal chronology, religious affiliation and cultural connections. Ceramic evidence (pottery) — pottery typology is extremely important archaeologically. Changes in pottery styles, manufacture and distribution can help establish chronology, settlement patterns and trade connections. Archaeobotany and palynology — ancient seeds, grains, charcoal and pollen can reconstruct agriculture, vegetation, diet and environmental change.
তো, সমতল ত্রিপুরায় যে বর্তমান প্রজন্মের বাঙালিদের পূর্বরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন যা আমি আগে বার বার দেখানো চেষ্টা করেছি — বক্সনগর, পিলাক, বিলোনিয়া মুদ্রাভাণ্ডার, ঊনকোটি , প্রচুর মূর্তি এবং অতিঅবশ্যই এতদঞ্চলে প্রাচীন কালের উদ্ধার করা মুদ্রা – যার মধ্যে এমনকি শশাঙ্কের আমলের ( ৬০০+ খৃ) মুদ্রাও রয়েছে।
এই ভাগে আমি কয়েকজন বিশিষ্ট আন্তর্জাতি খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিকের বক্তব্য তুলে ধরছি , পরবর্তী ভাগে উপাদানগুলির বিশ্লেষণ করা যাবে।
রমেশ চন্দ্র মজুমদার The History of Bengal, Vol. I: Hindu Period গ্রন্থে বর্তমান ত্রিপুরা-সংলগ্ন ভূখণ্ডের প্রাচীন ইতিহাস উঠে এসেছে মূলত সমতট এবং দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির ইতিহাসের অংশ হিসেবে। সমতটের অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে মজুমদার কুমিল্লা–নোয়াখালি অঞ্চলকে তার মূল ভূখণ্ডের মধ্যে রাখেন। সপ্তম শতকের সমতট-রাজা রাজরাজভট্টের রাজধানী কর্মান্তবাসক (Karmāntavāsaka)-কে তিনি কুমিল্লার প্রায় ১২ মাইল পশ্চিমে বড়কামতা অঞ্চলের সঙ্গে চিহ্নিত করার আলোচনা করেন। অর্থাৎ প্রাচীন সমতটের রাজনৈতিক কেন্দ্র বর্তমান ত্রিপুরার একেবারে সংলগ্ন ভূখণ্ডে অবস্থিত ছিল। (The History of Bengal, Vol. I, pp. 15–18.)
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, মজুমদারের আলোচনায় সপ্তম শতকের লোকনাথের তাম্রশাসন, খড়্গ শাসকদের দলিল এবং ময়নামতি–কুমিল্লা অঞ্চলের অন্যান্য epigraphic evidence-এর ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক ভূগোল উঠে আসে, তার প্রভাব বর্তমান ত্রিপুরার সমতল ও দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। পরবর্তী গবেষকেরা Majumdar-এর এই framework ব্যবহার করে আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে বর্তমান ত্রিপুরার উত্তর ও দক্ষিণের কিছু অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে সমতট ও হরিকেলের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যে পড়েছিল, যদিও ত্রিপুরার গভীর পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে একই দাবি করা যায় না। অতএব মজুমদারের কাছ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি আমরা পেতে পারি হল—আজকের Tripura-র রাজনৈতিক সীমানাকে পিছিয়ে সপ্তম বা অষ্টম শতকে বসিয়ে সেই সময়েও একই ভূখণ্ডে একটি অভিন্ন ‘Tripura kingdom’ ছিল বলে ধরে নেওয়া ঐতিহাসিকভাবে সমর্থিত নয়। সেই সময় বর্তমান ত্রিপুরার বিভিন্ন অংশের ইতিহাস বুঝতে হলে সমতট, কুমিল্লা–ময়নামতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যেই তার সূত্র খুঁজতে হবে।
পরবর্তী ক্ষেত্রে তাঁর লেখা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

অন্য আরেক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় কি বলেছেন দেখা যাক — তিনি বলছেন :
“ইউয়ান চুয়াংয়ের ( হিউয়েন ৎসাং ) বিবরণী পাঠে মনে মধ্যবাংলার অন্তত কিয়দংশ সমতটের অংশ ছিল , অথচ বর্তমান ত্রিপুরাও এই সমতটের অংশ ছিল সপ্তম হইতে আরম্ভ কোরিয়া দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তাহা অনস্বীকার্য , এ সম্বন্ধে সখ্য প্রমান প্রচুর। …..ষষ্ঠ শতকের গুনাইগড় লিপি ( ৫০৭-৮) — ( এই গুনাইগর বর্তমান বাংলাদেশে বর্তমান ত্রিপুরা খুব কাছেই অবস্থিত কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজিলা ) …ষষ্ঠ শতকের গোড়াতেই বাংলার পূর্বত প্রান্তে বর্তমান ত্রিপুরায় মহাজন বৌদ্ধ ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, গুনাইঘর লিপিই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমান। .. ..( বাঙালি ইতিহাস আদি পর্ব ডঃ নীহার রঞ্জন রায় )

এখানে গুনাইগড় তাম্রশাসন সম্পর্কে অল্প বলতে হয়। বৃহৎ বঙ্গে গুনাইগর তাম্রশাসন (৫০৭-৫০৮ খৃ ) সম্ভবত এতদঞ্চলের দ্বিতীয় প্রাচীন তাম্রশাসন। এর আগে মহাস্থানগড় তাম্রশাসন প্রাচীনতম (3rd century BCE). এবং এই গুনাইগর তাম্রশাসন ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সমতটের প্রথম ও প্রকৃত শাসনকর্তা বৈন্যগুপ্তের তাম্রশাসন। আর গুনাইগারঃ হল বক্সনগরের পশ্চিমে কুমিল্লার ১৮ কিমি উত্তরপূর্বে অবস্থিত। এই তাম্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি নিয়ে পরবর্তী ক্ষেত্রে অল্প বিস্তর আলোচনা করা যাবে।

ঐতিহাসিক ডঃ রত্না দাস লিখছেন : এখন পর্যন্ত এমন কোন প্রত্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয় নি যা খ্রিষ্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বে ত্রিপুরাতে ধারাবাহিক আধিপত্য প্রমাণিত করে। … ডঃ দাস রাজ্যে প্রাপ্ত বৌদ্ধিক স্থাপত্য এবং অন্যান্য নিদর্শন নিয়ে বলতে গিয়ে বলছেন : “রাজমালার কোন অংশেই বৌদ্ধ ধর্মকে রাজধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি অথবা পৃষ্ঠপোষকতার কোন উল্লেখ নেই। রাজ্ পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাতিত ধর্ম সংস্কৃতির এতো বড় কেন্দ্র ( বক্সানগর , পিলান ইত্যাদি) গড়ে উঠা সম্ভব ? ( ত্রিপুরা প্রসঙ্গ মে , ১৯৭৫ (পৃ ১১-১৫)..
ড নলিনীরঞ্জন রায়চোধুরী বলছেন : প্রাচীনকালে ত্রিপুরার একটি বোরো অংশ পূর্ব বাংলা ও সমতটের বিভিন্ন পরাক্রমশালী রাজবংশের অধীন ছিল। ..পিলাক সহ দক্ষিণ ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল তা সেখানকার প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে জানা যায়। ওই সময়ের কোন লিপি বা মুদ্রাতে ত্রিপুরার নাম পাওয়া যায় না। সুতরাং প্রাচীনকালে ত্রিপুরা নাম কোন রাজ্য ( বর্তমান) বর্তমান ত্রিপুরা অঞ্চলে গড়ে ওঠেনি বলেই মনে হয় ” ( মানিক্য শাসনাধীন ত্রিপুরার ইতিহাস , পৃ ১১-৩০) .
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে বর্তমান ত্রিপুরা ইতিহাসে প্রথম ত্রিপুরা ( ত্রিপুরেন্দ্র শব্দটি পাওয়া যায় মহারাজ ধন্যমাণিক্যের ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দের এর এক মুদ্রায় ( ১৪১২ শকাব্দ) ত্রিপুরেশ্বরী শব্দটি পাওয়া যায় ১৪৩৫ শকাব্দে ( ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দ) . এখানে আবার উল্লেখ করতে হয় , সমুদ্রগুপ্তের করদ রাজ্য বলে সমতট সহ যে কর্তৃপুরার উল্লেখ রয়েছে এলাহাবাদ প্রশস্তিতে সেটি এই ত্রিপুরা নয়। ASI ও ঐতিহাসিকরা এই কর্তৃপুরা উত্তরাখণ্ডের একটি স্থান বলে নিশ্চিত হয়েছেন। এখানে আমি ডাইরেক্ট ASI রিলেটেড বক্তব্য দিচ্ছি – The Allahabad (Prayāga) Pillar Inscription of Samudragupta, composed by Hariṣeṇa and dated to the mid-fourth century CE, lists frontier (pratyanta) rulers:
samataṭa-ḍavāka-kāmarūpa-nepāla-kartṛpurādi-pratyanta-nṛpatibhiḥ. Samataṭa is thereby established as a recognisable eastern
kingdom by the fourth century. The sequence runs Samataṭa – Davāka – Kāmarūpa – Nepāla – Kārttṛpura. এখন এই Kārttṛpura cannot be identified with modern Tripura. Official Archaeological Survey of India interpretations (Dehradun Circle and
related publications) locate it in the Central Himalayan/Uttarakhand region, relating the name to later Katyūr/Kārttikeyapura traditions.

আরেকটি কথাও প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় ‘ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির’ও কিন্তু শুধু উদয়পুর নয় ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় রয়েছে। ( উদাহরণ : Tripuri Sundri Mata temple is at Tewar (Tevar), on the Bhedaghat side of Jabalpur, (এই মন্দির উদয়পুরের ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরের চেয়েও প্রাচীন বলে মনে হয় – ১১ শতাব্দী, এবং প্রাচীন ত্রিপুরী ( Tewar ) রাজ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি যুক্ত Tripura Sundari Temple, Banswara, Rajasthan, Bala Tripura Sundari Temple, Tripurakot, Dolpa, Nepal, Tripura Sundari/Tripureshwari Temple, Baitadi, Nepal)
এবার দেখা যাক প্রখ্যাত জাপানি ঐতিহাসিক ইতিহাসবিদ ও লিপিতত্ত্ববিদ রিয়োসুকে ফুরুই কি বলছেন।
রিয়োসুকে ফুরুই যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ল্যান্ড অ্যান্ড সোসাইটি ইন আর্লি সাউথ এশিয়া’ সহ একাধিক গবেষণাপত্রে প্রাচীন ত্রিপুরা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছেন।
তাঁর মতে প্রাচীন ত্রিপুরা ছিল সমতট ও হরিকেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং প্রাচীন ত্রিপুরার ইতিহাস পুনর্গঠনে আধুনিক রাজনৈতিক সীমানা কিংবা মধ্যযুগীয় রাজকাহিনীর চেয়ে লিপিতাত্ত্বিক প্রমাণ যে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, তা আবারও প্রমাণ করলেন খ্যাতনামা জাপানি অধ্যাপক রিয়োসুকে ফুরুই। তাঁর মতে, প্রাচীন ত্রিপুরাকে কোনো বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বর্তমান ত্রিপুরা ছিল প্রাচীন ভূ-রাজনৈতিক মণ্ডলের অন্তর্গত ‘সমতট’ ও ‘হরিকেল’ (দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) অঞ্চলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোটামোটি ভাবে তিনি যা বলেছেন সেগুলিকে এভাবে তুলে ধরা যেতে পারে —-
:১. সমতটের পার্বত্য সীমান্ত বা ‘অটবী-খণ্ড’অধ্যাপক ফুরুই দেখিয়েছেন যে, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতকের মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সমতল ভূমির সঙ্গে আধুনিক ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চল যুক্ত হয়ে প্রাচীন ‘সমতট’ রাজ্য গড়ে উঠেছিল। এই রাজ্যের পাহাড়ি অংশটিকে তিনি সমতটের ‘অটবী-খণ্ড’ বা অরণ্য বিভাগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তৎকালীন শাসনকেন্দ্রগুলো (যেমন দেবপর্বত) সমতলে অবস্থিত হলেও, রাজকীয় সামরিক বাহিনীর জন্য অপরিহার্য বুনো হাতি, মূল্যবান কাঠ ও বনজ সম্পদের জন্য প্রাচীন শাসকেরা ত্রিপুরার এই পাহাড়ি অঞ্চলের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিলেন।
২. ভূমিদান ও রাজ্য সম্প্রসারণের রাজনীতিফুরুইয়ের গবেষণার অন্যতম প্রধান দিক হলো প্রাচীন বাংলায় রাষ্ট্রশক্তির বিস্তারের প্রক্রিয়াটি উন্মোচন করা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সমতটের খড়্গ, রাত ও দেব রাজবংশের শাসকেরা তাঁদের রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ বিহারগুলোকে ভূমিদানের জন্য সংস্কৃত তাম্রশাসন ব্যবহার করতেন। শাসকেরা ত্রিপুরার পাহাড়ি উপত্যকার উর্বর জমিগুলোকে এই ভূমিদানের লক্ষ্যবস্তু বানাতেন। এর ফলে একদিকে যেমন বনাঞ্চল পরিষ্কার করে স্থায়ী ধান চাষ শুরু হয় (কৃষিভিত্তিক সম্প্রসারণ), অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আধুনিক ত্রিপুরা অঞ্চলটি ধীরে ধীরে বাংলার বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
৩. হরিকেলের উচ্চমূল্যের রৌপ্য অর্থনীতি আরেকটি যৌথ গবেষণাপত্রে অধ্যাপক ফুরুই এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবনকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তৎকালীন উত্তর ও পশ্চিম বাংলা যখন গ্রামীণ লেনদেনের জন্য কড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন ফুরুই প্রমাণ করেছেন যে সমতট, হরিকেল এবং সীমান্তবর্তী ত্রিপুরা অঞ্চলে একটি অত্যন্ত উন্নত মানের রৌপ্যমুদ্রা-ভিত্তিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক চালু ছিল। এই মুদ্রা অর্থনীতি প্রাচীন ত্রিপুরাকে তৎকালীন আরকান (বর্তমান মিয়ানমার) পর্যন্ত বিস্তৃত সামুদ্রিক ও স্থলভাগের সক্রিয় বাণিজ্য রুটের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
( এখানে মনে রাখতে হবে যে ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী বা ত্রিপুরিদের মধ্যে মুদ্রাভিত্তিক বাণিজ্য নয় এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত বার্টার সিস্টেম চালু ছিল। রত্নমাণিক্য ১৪৬৪ তে রাজকীয় মুদ্রা চালু করেন , তাতে সমতল অঞ্চলে বাঙালি অধ্যষিত এলাকায় বাজার অর্থনীতিকেই দেখায়। পার্বত্য এলাকার রেভিনিউ আসে বা বাজার তখন বারটার সিস্টেমে। সেখান থেকে আধুনিক রাজাদের রাজস্ব আসতো ঘর চুক্তি হিসাবে।)
আবার আসা যাক রিয়োসুকে ফুরুই-এ। তিনি বলছেন —
৪. স্বাধীন ‘সামন্ত’ বা আঞ্চলিক রাজন্যবর্গ প্রাচীন ত্রিপুরা অঞ্চলটি পাল সাম্রাজ্যের মতো কোনো একক কেন্দ্রীয় শক্তির কঠোর শাসনাধীনে ছিল না । তাঁর মতে, এই অঞ্চলে ‘সামন্ত’ বা অধীনস্থ আঞ্চলিক শাসকদের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ও প্রভাব ছিল। এই স্থানীয় প্রধানেরা নিজেদের মাটির শক্তির ওপর ভিত্তি করে শাসন পরিচালনা করতেন এবং সমতলের রাজবংশের সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এক ধরনের রাজনৈতিক ভারসাম্য বা শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন।লিপিতাত্ত্বিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অধ্যাপক রিয়োসুকে ফুরুইয়ের এই গবেষণা প্রাচীন ত্রিপুরার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলা যেতে পারে। যে কেউই তাঁর “”ল্যান্ড অ্যান্ড সোসাইটি ইন আর্লি সাউথ এশিয়া’ পড়ে দেখতে পারেন””।
ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ লিঙ্কন রিয়াং ও Jonomti Reang তাঁদের রিসার্চ পেপার এ লিখছেন : Pilak has significant ties to Harikela and Samatata. According to some scholars, up to the thirteenth century, present Tripura was under Samatata and Harikela provinces…..In the seventh and eighth centuries, Hindu rulers such as Purnachandra and Subarnachandra also ruled over the Lalmal hill. All of these Buddhist and Hindu royal dynasties were believed to have patronised the Pilak archaeological site.14 During the Buddhist era in Pilak, the Mog people began to widely practise this religion. The word ‘pilak’ is said to have
originated from Mog language, which means ‘hidden wealth or treasure’…….The Pashchimbhag copper plate, which was found in the village of Pashchimbhag in the present- day Sylhet district of Bangladesh, provided evidence that the whole region of Unakoti, Kailashahar and other nearby areas was ruled by Chandra in the 10th century. ( A Historical Study on the Archaeological Sites of Pilak and Unakoti of Tripura)
|Also Read : https://www.researchgate.net/publication/411901086_A_Historical_Study_on_the_Archaeological_sites_of_Pilak_and_Unakoti_of_Tripura |
এবার আসা যাক এক প্রখ্যাত মুদ্রা বিষয়ক বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে ( পরে আরো বিশদে স্পেসিফিক মুদ্রা সহ আলোচনা করা যেতে পারে )
প্রখ্যাত গবেষক রবার্ট এস. উইক্সের মুদ্রাতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণ হয় , বর্তমান দক্ষিণ ত্রিপুরাকে কোনোভাবেই প্রাচীন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। উইক্সের নথিবদ্ধ ‘Bull–Trisula’ (ষাঁড়-ত্রিশূল অঙ্কিত) মুদ্রার বণ্টন বিন্যাস বা ডিস্ট্রিবিউশন ম্যাপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ময়নামতি, সিলেট, পাহাড়পুর এবং আরাকানের স্যান্ডওয়ের (Sandoway) মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলির সমান্তরালে, আমাদের রাজ্যের দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়া থেকেও এই ধরণের কয়েকশো প্রাচীন মুদ্রার সন্ধান পাওয়া গেছে।মুদ্রার গায়ে হরফে বিবর্তন:গবেষণায় আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। এই একই কয়েন-সিরিজের লিপি বা ইনস্ক্রিপশনে (Inscription) প্রথমে ‘Harikela’ (হরিকেল) লেজেন্ড এবং পরবর্তী ধাপে বাংলা হরফের আদি রূপের (Bengali letter-form) সুস্পষ্ট ব্যবহার লক্ষ্য করেছেন গবেষক উইক্স।বৃহত্তর আর্থিক জোনের অংশ বিলোনিয়া:ইতিহাসবিদদের মতে, এই মুদ্রাতাত্ত্বিক প্রমাণ বা ‘numismatic evidence’ অত্যন্ত জোরালো।
এর ওপর ভিত্তি করে এটি এখন নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, প্রাচীন যুগে আজকের দক্ষিণ ত্রিপুরা অঞ্চলটি একটি বৃহত্তর এবং অত্যন্ত সক্রিয় ‘Samatata–Harikela–Arakan monetary interaction zone’ বা সমতট-হরিকেল-আরাকান মুদ্রা বিনিময় ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন আমাদের এই অঞ্চলের প্রাচীন সমৃদ্ধিকেই নতুন করে তুলে ধরছে।
এই আর্টিকেল পরে অনেকেরই প্রশ্ন জাগবে , অনেকেই মেনে নিতে পারবেন না। আমার অনুরোধ থাকবে সূত্র তো দিয়ে দিয়েছিই , তার পরেও, দেখা উল্লিখিত যেকোন বক্তব্য ধরে আপনারা নিজেরাই সার্চ করে নিতে পারবেন।
চলবে
Some spelling mistakes etc may appear in this article.






